আজ কবিগুরুর জন্মদিন
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে,তবে একলা চলো রে।
আজ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মবার্ষিকী। সাহিত্যে নোবেলজয়ী এই কবি কোলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে ৭ই মে ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
১৮৭৫ সালে কবির মা মারা যাওয়ার পর পিতা দেবেন্দ্রনাথের সান্নিধ্য তেমন আর পাননি। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে। নামকরা কিছু স্কুল, কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছিলেন। লেখাপড়ায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষকের তত্বাবধানে রাখা হয় তাকে। কিন্তু ঐ "যে একলা চলোরে " লাইনটির মত তার বেশিরভাগ সময় কাটতো বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে। ১২ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি কয়েক মাস পিতার সঙ্গে দেশভ্রমণে বের হন। প্রথমে তারা আসেন শান্তিনিকেতনে কিছুদিন কাটিয়ে পাঞ্জাবের অমৃতসরে শিখদের উপাসনা পদ্ধতি পরিদর্শন করেন। পিতা দেবেন্দ্রনাথ তাকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জীবনী, কালিদাস রচিত ধ্রুপদি সংস্কৃত কাব্য ও নাটক এবং উপনিষদ্ পাঠেও উৎসাহিত করতেন তাছাড়া সংস্কৃত ব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইতিহাসের নিয়মিত পাঠদান দিতেন।
ভারতী পত্রিকায় ১৮৭৭ সালে তরুণ রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হয়। এগুলি হল মাইকেল মধুসূদনের "মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা", ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী এবং "ভিখারিণী" ও "করুণা" গল্পদুটি।
তার ছদ্দনাম "ভানুসিংহ" এর থেকেই অনুপ্রাণিত। ভিখারিনী গল্পটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছোটগল্প। ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ "কবিকাহিনী"।
ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে ১৮৭৮ সালে ইংল্যান্ডে যান রবীন্দ্রনাথ।[৭১] প্রথমে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সেই পড়াশোনা আর আগায় নি। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন শেকসপিয়র ও অন্যান্য ইংরেজ সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটার পর তিনি বিশেষ মনোযোগ সহকারে রিলিজিও মেদিচি, কোরিওলেনাস এবং অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা মনোযোগ সহকারে পাঠ করেন। ইংল্যান্ডবাসের অভিজ্ঞতার কথা ভারতী পত্রিকায় পত্রাকারে পাঠাতেন রবীন্দ্রনাথ ঐ লেখাগুলিতে জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমালোচনাসহ প্রকাশিত হত য়ুরোপযাত্রী কোনো বঙ্গীয় যুবকের পত্রধারা নামে। ১৮৮১ সালে সেই পত্রাবলি য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র নামে কবির প্রথম গদ্যগ্রন্থ গ্রন্থাকারে ছাপা হয় যা ছিলো চলিত ভাষায় লেখা তার প্রথম কোন গ্রন্থ। প্রায় দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে ১৮৮০ সালে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে এবং ব্যারিস্টারি পড়া শুরু না করেই তিনি দেশে ফিরে আসেন।
ঠাকুরবাড়ির অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীকে (মৃণালিনী দেবী )১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বিয়ে করেন কবিগুরু এবং পাঁচ সন্তানের জনক হন। পিতার আদেশে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করাকালীন জমিদার রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে "পদ্মা" নামে একটি বিলাসবহুল পারিবারিক বজরায় চড়ে প্রজাবর্গের কাছে খাজনা আদায় ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে যেতেন। গ্রামবাসীরাও তার সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করত এবং তিনি তাতে মুগ্ধ হতেন প্রায়সই। ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথের অপর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মানসী প্রকাশিত হওয়ার পর নিজের সম্পাদিত সাধনা পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু উৎকৃষ্ট রচনা প্রকাশিত হয়। এই পর্যায়কে সাধনা পর্যায় বলে।
রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুরের শান্তিনিকেতনে ১৯০১ সালে। এখানে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৮ সালে একটি আশ্রম ও ১৮৯১ সালে একটি ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
নৈবেদ্য ও ১৯০৬ সালে খেয়া কাব্যগ্রন্থের পর ১৯১০ সালে তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয়। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি (ইংরেজি অনুবাদ, ১৯১২) কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত নাইটহুড উপাধি ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঘৃণাভরে ত্যাগ করেন কবি।
জীবনের শেষের দিকে ৫০ টির বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় কবির। তার বিখ্যাত সৃষ্টিগুলো হলো, গীতাঞ্জলি, গোরা, ঘরে - বাইরে, শেষের কবিতা ইত্যাদি।
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
মতামত দিন